দিনাজপুরনিউজ২৪ ডটকমের ব্লগসাইটে আপনাকে স্বাগতম!

সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য

প্রকাশঃ ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য

দিনাজপুর- ঐতিহ্য, ইতিহাস আর পুরানের দেশ

দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী একটি প্রাচীনতম জেলা যার পরতে পরতে আছে পৌরাণিক কাহিনী, রাজ-রাজরাদের ইতিহাস আর আছে নিজস্ব কিছু ঐতিহ্য যা একান্তই আপন। চলুন আজ জেনে আসা যাক দিনাজপুরের কথা।

নামকরণের ইতিহাস
নামকরণ নিয়ে জনে জনে রয়েছে নানা মতবাদ।তবে বহুল প্রচলিত মতবাদ হিসেবে বলা হয়ে থাকে এই অঞ্চলের জনপ্রিয় রাজা ছিলেন রাজা দিনাজ (মতান্তরে দিনারাজ)। তাঁরই নামানুসারে এই এলাকার নাম হয় দিনাজপুর। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসকরা যখন ঘোড়াঘাট সরকার বাতিল ঘোষণা করেন, রাজার জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে দিনাজপুর নামটিই বহাল রাখেন।

এক নজরে জেলা পরিচিতি
৩৪৪৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই জেলায় লোকসংখ্যা প্রায় ৩১,০৯,৬২৮ জন যার মধ্যে সাক্ষরতার হার ৫৩%। ১৩ টি উপজেলা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই জেলার মূল অর্থনৈতিক হাতিয়ার হল কৃষি। কৃষি সম্পদে ভরপুর এই জেলা দেশের ‘শষ্যভান্ডার’ নামে পরচিত। এই চালের অভাবনীয় উৎপাদনের জন্য জেলার ৯০ ভাগ কলকারখানাই চালের কল। বাদ বাকি যা আছে তার মধ্যে সেতাব গঞ্জ চিনির কল ও দিনাজপুর টেক্সটাইল মিল বলার মত।

এ তো গেল জেলার কেতাবি পরিচয়। কিন্তু এ জেলার আসল বৈশিষ্ট্য এর দর্শনীয় স্থান, ঐতিহ্যবাহী খাবার আর সহজ সরল মানুষে। চলুন দেখে নেয়া যাক কি কি আছে দিনাজপুরে।

দর্শনীয় স্থান সমুহ

কান্তজীউ মন্দির
কান্তজীর মন্দির বা কান্তজীউ মন্দির বা কান্তনগর মন্দির ১৮ শতকে নির্মিত একটি প্রাচীন স্থাপনা যা দেশের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় একটি মন্দির। কান্ত অর্থাৎ কৃষ্ণ দেবতা। এটি মূলত কৃষ্ণ মন্দির। এই মন্দিরের আরেক নাম নবরত্ন মন্দির। নামকরণের কারন হল তিনতলা বিশিষ্ট এই মন্দিরের নয়টি (নব>নয়) চূড়া ছিল। মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তার ছেলে রামনাথ রায় এর কাজ সম্পন্ন করেন।

মন্দিরটিতে ১৫০০০ এর ও বেশি টেরাকোটা টালি আছে। রয়েছে অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক। এই ফলক গুলোতে খচিত আছে রামায়ন, মহাভারত আর রাধা কৃষ্ণ এর মত পৌরাণিক কাহিনী যা আজো মানুষকে অবাক করে তোলে।

রামসাগর
দিনাজপুরে আরো আছে রামসাগর। এটি মনুষ্য নির্মিত সবচেয়ে বড় দিঘী। ৪,৩৭,৪৯২ বর্গমিটার আয়তনের এই দিঘীও ১৮ শতকে রাজা রামনাথ কর্তৃক নির্মিত। যদিও অনেকের মতবাদ এটি রাজা প্রাণনাথ রায় বানিয়েছিলেন।

এই দিঘীর নামকরণের পেছনে আছে করুণ ইতিহাস। জনশ্রুতি আছে, একবার প্রচন্ড খরায় যখন জনজীবন পর্যুদস্ত, প্রজারা রাজা প্রাণনাথ রায়ের কাছে আসেন সাহায্যের জন্য। প্রজাদরদী রাজা প্রচুর অর্থ আর লোকবল লাগিয়ে এই দিঘী খনন করান। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় পানির দেখা আর মেলে না। একদিন রাজা স্বপ্নে দেখতে পান যদি তার পুত্রকে এই দিঘীর জন্য উৎসর্গ করতে পারেন তবেই আসবে পানি। প্রজার দুঃখ ঘোচাতে রাজা দিঘীর মাঝখানে একটি মন্দির নির্মাণ করেন। পরদিন ভোরে সাদা পোশাকে রাজপুত্র রামনাথ হাতির পিঠে চড়ে সেই মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। একসময় মন্দিরে প্রবেশ করেন। সাথে সাথে মাটি থেকে পানির ধারা বের হতে শুরু করে যাতে তলিয়ে যান রাজপুত্র। সেই থেকে রাজপুত্রের স্বরণে এই দিঘীর নাম হয় রামসাগর।

বর্তমানে রামসাগর একটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে যাতে একটি উদ্যান, শিশুপার্ক ও একটি চিড়িয়াখানা রয়েছে।

স্বপ্নপুরী
মূলত একটি এমিউজমেন্ট পার্ক ও পিকনিক স্পট হিসেবে পরিচিত এই স্বপ্নপুরী। প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে বিনোদনের সকল উপাদান পাবেন এই পার্কে। চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক, কৃত্রিম পাহাড়, ঝর্ণা, লেক, বাগান এবং বিভিন্ন পশুপাখির মূর্তি আপনাকে দেবে বিনোদন। উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় এই বিনোদন পার্কটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালে।

রাজবাড়ি
রাজবাড়ি দিনাজপুরের প্রতিষ্ঠাতা রাজা দিনাজের প্রাসাদ ছিল। বর্তমানে ভগ্নপ্রায় এই স্থাপনাটি প্রাচীন বাংলার একটি বিশেষ ঐতিহ্য। ১৬.১৪ একর জমি জুড়ে অবস্থিত এই স্থাপনায় ছিল দিঘী, টেনিস কোর্ট, বাগান, পরিখা এমনকি চিড়িয়াখানা পর্যন্ত। ছিল আয়না মহল, রাণীমহল এবং ঠাকুরমহল নামক তিনটি আলাদা মহল।

হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
দিনাজপুরে রয়েছে হাবিপ্রবি যা তেভাগা আন্দোলনের জনক ও অন্যতম জনপ্রিয় কৃষক নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশ এর নামানুসারে রাখা হয়েছে। শুরুতে এটি কৃষি কলেজ হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর অধীনে থাকলেও পরবর্তীতে পূর্নাঙ্গ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০০২ সালে যাত্রা শুরু করে। দর্শনীয় স্থান হিসেবে ১৩০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দর ও মনোরম পরিবেশ খুব সহজেই যে কারো মন ভরাতে সক্ষম।

যদি নৌকায় ঘুরতে চান তবে আছে আত্রাই, করতোয়া, কাঁকড়া সহ ১২ টি নদী।

এছাড়াও ঘুরে দেখার জন্য আছে স্থলবন্দর হিলি, প্রাচীন বিহার সীতাকোট, বিরামপুর শালবন, ফুলবাড়ি কয়লার খনি, নবাবগঞ্জে অবস্থিত সোনাভানের ধাপ, দেশের সর্ববৃহৎ রেইল জাংশন পার্বতীপুর।

দিনাজপুরের বিখ্যাত খাবার
দিনাজপুর বিখ্যাত তার সুগন্ধি আতপ চালের জন্য। আছে কাটারী ভোগ চাল। দিনাজপুরের চায়না ৩ লিচু সারা বাংলাদেশে বিখ্যাত তার স্বাদের জন্য। চিড়া এবং খই এর ও খুব সুনাম এই অঞ্চলের। আছে মসুর ডালের সুস্বাদু পাঁপড়। পিঠা পুলির মধ্যে আছে নুনিয়া পিঠা, গুড়্গুড়ি পিঠা (অনেকে একে কুকুর ঢেলাও বলে থাকে)। আর আছে শিদল। কচু, পুটি মাছ আর নানা শাক পাতা মিশিয়ে গাঁজন পদ্ধতিতে তৈরি হয় এই শিদল।

দিনাজপুর সম্পর্কে কিছু তথ্য
★জাতীয় ক্রিকেট দলের দুজন সদস্য ধীমান ঘোষ আর লিটন দাস কিন্তু দিনাজপুরের মানুষ।
★সবচেয়ে বেশি নারী মুক্তিযোদ্ধা দিনাজপুরের- ২১ জন ( মতান্তরে ২৩ জন)
★দিনাজপুরে ৮৫০০ এর বেশি মসজিদ রয়েছে
★এখানে রয়েছে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন

২০০৯ সালে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে রুপান্তরিত হয়।

সকলের জ্ঞাতার্থে জানাতে চাই যে, এই অসাধারণ অঞ্চলটি ঘোরাঘুরির জন্য হতে পারে একটি পারফেক্ট জায়গা। তাহলে আর দেরী কেন, ঘুরে আসুন উত্তরবঙ্গের প্রান- দিনাজপুর।

ব্লগার মোঃ মাসুদ রানা এর অন্যান্য পোস্টঃ
আপনার পছন্দের তালিকায় আরও থাকতে পারেঃ
2 মন্তব্য
  1. সুন্দর হয়েছে মাসুদ। তোমার কাছে আরও সুন্দর সুন্দর লেখা আমরা আশা করছি

  2. সুন্দর হয়েছে মাসুদ। তোমার কাছে আরও সুন্দর সুন্দর লেখা আমরা আশা করছি

আপনার মতামত দিন
বাংলা বর্ণমালার চতুর্থতম বর্ণ কোনটিঃ
Hit enter to search or ESC to close
হ্যালো, আমার নাম

মোঃ মাসুদ রানা